রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪২ অপরাহ্ন

কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লিতে শ্রমঘণ্টা ও পারিশ্রমিক নিয়ে শ্রমিকদের আক্ষেপ

কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লিতে শ্রমঘণ্টা ও পারিশ্রমিক নিয়ে শ্রমিকদের আক্ষেপ

আনাস আহমেদ, কেরানীগঞ্জ থেকে  ঃ

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লিতে তৈরি পোশাকের পাইকারি বাজারে হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা শেষ পর্যায়ে। ব্যবসায়ীদের আশা, এবার ঈদকে কেন্দ্র করে পোশাকপল্লিতে বিক্রি সাত হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে বেচাকেনার এই চাঙ্গা চিত্রের আড়ালে রয়েছে পোশাকপল্লির শ্রমিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও পারিশ্রমিক নিয়ে অসন্তোষ।

শ্রমিকদের অভিযোগ, ঈদ, শীত কিংবা কোরবানির ঈদ মৌসুমে তাদের নির্ধারিত সময়ের বাইরে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী তাঁদের বাড়তি পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।

পোশাক পল্লির আলম টাওয়ার, আশা কমপ্লেক্স, খাজা মার্কেট, হাজী করিম মার্কেট, নুরু মার্কেট, মশিউর মার্কেটসহ চরকালীগঞ্জ ও কালীগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন শোরুমের কর্মচারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর, পূর্ব আগানগর, চরকালীগঞ্জ, কালীগঞ্জ ও খেজুরবাগসহ প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লি। এখানে প্রায় ১৫ হাজার শোরুম ও পাঁচ হাজারের বেশি ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এসব কারখানা ও বিপণিবিতানে কয়েক লাখ শ্রমিক কাজ করছেন।

পূর্ব আগানগর এলাকার খাজা মার্কেটের একটি পাঞ্জাবি শোরুমের কর্মচারী সাব্বির হোসেন (২৩) বলেন, সাধারণ সময়ে আমাদের ডিউটি থাকে আট ঘণ্টা। কিন্তু রোজার সময় প্রায় দুই মাস ধরে প্রতিদিন ১৩–১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। তবু বাড়তি সময়ের জন্য আলাদা কোনো পারিশ্রমিক পাই না। সাভার ও গাজীপুরের গার্মেন্টস এলাকায় ওভারটাইমের টাকা দেওয়া হলেও এখানে সে ব্যবস্থা নেই।

মশিউর মার্কেটের আরেক কর্মচারী শফিক হোসেন (৪২) বলেন, এবার মূল বেতনের সমপরিমাণ বোনাস পেয়েছি। কিন্তু ঈদকে কেন্দ্র করে গত দেড় মাস অতিরিক্ত সময় কাজ করার জন্য কোনো টাকা পাইনি। রোজার সময় অনেক দিন রাত জেগে কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু খাটনির তুলনায় প্রাপ্যটা পাই না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আগানগর এলাকার হাজী করিম মার্কেটের এক কর্মচারী (২৮) বলেন, মালিকেরা বেতন দিলেই মনে করেন আমাদের রুহসহ সবকিছু কিনে নিয়েছেন। তাঁরা ইচ্ছেমতো কাজ করান। পরিবারে কোন ইমারজেন্সি ঘটনা ঘটলেও কাজ রেখে যেতে দেননা। বিকল্প না থাকায় অনেক সময় বাধ্য হয়ে চুপ করে থাকতে হয়।

চরকালীগঞ্জ এলাকার একটি কারখানায় আয়রনম্যান হিসেবে কাজ করেন আবদুল মালেক (৩৮)। ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে রাত গভীর করে ফিরতে হয় তাঁকে। রমজান মাসে কাজের চাপ আরও বেড়ে যায়। মালেক বলেন, ঈদের আগে কাজের চাপ এত বেশি থাকে যে অনেক দিন রাত ১২টার আগে বাসায় ফিরতে পারি না। তখন ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়ে। এত কষ্ট করেও আমরা ছেলে-মেয়েদের ঈদের আবদার মেটাতে পারিনা। ঈদ এলেও আমাদের জন্য আনন্দটা অনেক সময় চাপা কষ্টের মতো লাগে।

নারী শ্রমিকদের মধ্যেও একই ধরনের আক্ষেপ রয়েছে। চরকালীগঞ্জ এলাকার নারী শ্রমিক হালিমা খাতুন (৩৪) বলেন, শবে বরাতের পর থেইক্যা কাজের চাপ বহুত বাইড়া যায়। কাম সাইরা বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হইয়া যায়। সংসার আর পুলপান সামলাইয়া সকালে কামে যাইতে অয়। কিন্তু এত খাটলেও বাড়তি কোন টাকা পাই না।

পূর্ব আগানগর এলাকার আলম মার্কেটে তৈরি পোশাক কারখানার কর্মচারী আলেয়া বেগম (৩২) বলেন, ঈদ সামনে থাকলেও নিজের পরিবারের জন্য ঠিকমতো কেনাকাটা করতে পারি না। বেতন আর বোনাসে কষ্ট করে সংসার চালাতে হয়। আমরা চাই আমাদের কাজের ন্যায্য মূল্য দেওয়া হোক।

কালিগঞ্জ এলাকার ফ্যাশন হাউজের স্বত্ত্বাধিকারী শহিদ হোসেন বলেন, আমার শোরুমে চারজন কর্মচারী রয়েছেন। প্রতিবছর শ্রমিকদের বেতনের সঙ্গে বোনাস দেওয়া হয়। কয়েক বছর ব্যবসার পরিবেশ ভালো না থাকলেও আমরা কর্মচারীদের বেতন–বোনাস দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ব্যবসা খারাপ হলে ক্ষতির বড় অংশ ব্যবসায়ীকেই বহন করতে হয়। এরপরও সেই প্রভাব কর্মচারীদের ওপর পড়তে দিই না।

এস আলম মার্কেটের আরেক ব্যবসায়ী শফিউল আলম বলেন, পোশাকপল্লির ব্যবসা পুরোপুরি মৌসুমি। ঈদের সময় বিক্রি ভালো হলেও অন্য সময় অনেক দোকানে বিক্রি খুবই কম থাকে। তখন ঈদের মুনাফা দিয়ে সারাবছর চলতে হয়। তবু আমরা কর্মচারীদের ধরে রাখতে চেষ্টা করি। ব্যবসা ভালো হলে শ্রমিকদের সুবিধা বাড়ানোর বিষয়েও ভাবা যেতে পারে।

এদিকে কেরানীগঞ্জ গার্মেন্টস ও দোকান সমিতির কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি সৈয়দ মো. আলী বলেন, ২০০৬ সালের পর থেকে আমাদের সংগঠনের নির্বাচন হয়নি। ফলে শ্রমিকদের অনেক দাবি মালিকপক্ষের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। শুরুতে আমাদের পোশাকপল্লিতে কোনো ছুটি ছিল না। পরে আলোচনার মাধ্যমে বছরে আট দিনের ছুটি নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থে আমাদের নানাবিধ দাবি রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা বেঁধে দেওয়া। রোজার ঈদ, কোরবানির ঈদ ও শীত মৌসুমে শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। অথচ তারা এর বিনিময়ে কোন পারিশ্রমিক পান না। কিছু ব্যবসায়ী ঈদের ফুল বোনাসও দেন না।

অনেকে সন্ধ্যায় নাস্তার টাকা দিতেও অপারগতা প্রকাশ করেন। এসব মানসিকতা থেকে কিছু ব্যবসায়ীদের বের হয়ে আসা উচিত। কেরানীগঞ্জ পোশাকপল্লি দেশের অন্যতম বড় পাইকারি পোশাক বাজার। তাই ব্যবসার পাশাপাশি এখানে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা চাই ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে সমাধানের পথ বের হোক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com